এক সাহসী স্বপ্নদেখা তরুণ মেহেদী হাসান

1


Published : ০৯.০২.২০১৯ ১২:০৯ অপরাহ্ণ BdST

দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন অগ্রগতি ও মানবতার কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে আঠারো বছরের লাখো তরুণ। এসব তরুণদের প্রতিনিধি হয়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশের  চুয়াডাঙ্গা জেলার  প্রায় ২৫ কিঃমিঃ দূরে চন্ডিপুর নামক একটি ছোট্ট গ্রামের সন্তান মেহেদী হাসান।  স্বপ্ন দেখেন শোষণ, দারিদ্র,  দুর্নীতি মুক্ত, অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলার যেখানে সব কিছুর উর্ধে মানুষ মানুষের জন্য নিবেদিত প্রাণ হয়ে থাকবে।


তার লালিত স্বপ্ন আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি নিয়ে সেচ্ছাসেবী হিসেবে যেমন সফলতার সাথে কাজ করছেন তেমনি একজন তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবেও নিজের জায়গা করে নিয়েছেন। তার এই পথচলার অভিজ্ঞতা  নিয়েই  আজকের সাক্ষাৎকার।


সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: আরেফীন দিপু   


প্রশ্ন : শুরুতেই জানতে চাই আপনার ছোট বেলা সম্পর্কে?

মেহেদী হাসান : আমার ছেলেবেলাটা খুবই সাধারণ ছিলো। খুবই উচ্ছল ও মিশুক ছিলাম আমি। গ্রামে বেড়ে ওঠা আর দশটা ছেলের মতোই ছিলো আমার ছেলেবেলা। আমি আমার শৈশব-কৈশোর পার করেছি গ্রামে। গ্রামটা ছিলো অসাধারণ৷ গ্রামের সেই সবুজ শস্যক্ষেত্র, নদী-নালা পুকুর আমাকে সবসময়ই টানে। আমি ছিলাম অত্যন্ত দূরন্তপণা। টো-টো করে ঘুরে বেড়ানো, তরতর করে গাছের মগডালে উঠে পরা, বন্ধুরা মিলে অন্যের গাছের ফলমূল চুরি করে মাঠে বসে খাওয়া, এই আমার শৈশব, এই আমার ছেলেবেলা। ছোটবেলা থেকেই আমার মধ্যে একটা জিনিষ ছিলো যে, অন্যদের বিপদে পাশে থাকা। আমি অনেক সময় টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে মানুষদের সাহায্য করেছি।

প্রশ্ন : ক্যারিয়ার শুরু হল যেভাবে ?

মেহেদী হাসান :  আমার ক্যারিয়ার শুরুর জায়গাটা ছোটবেলা থেকেই। শুরুতে আমার তেমন কোনো পরিচিত মানুষজন ছিলো না। এসএসসি পাশ করার পরে ঢাকায় যাই। সেখানে কলেজে ও ডিপ্লোমা করি। আমার একটা গুণ ছিলো যে, মানুষের সাথে মেশা। যোগাযোগ দক্ষতা ভালো ছিলো বলে বয়সের তুলনায় বেশি মানুষের সাথে আমার পরিচয় ঘটে। ক্যারিয়ারের শুরুতে আমি গাজীপুরের প্লেজ হারবার স্কুল এন্ড স্পোর্টস একাডেমিতে কাজ শুরু করি যেটার বর্তমান নাম প্লেজ হারবার ইন্টারন্যাশনাল স্কুল। আট-নয় মাস এখানে কাজ করি। এরপর ঢাকায় এসে একটা কোচিং সেন্টারে পড়ানো শুরু করি। এক-দেড় বছর সেখানে কাজ করি। এর সাথে করতাম টিউশনি। আমার এক ছাত্রের বাবা এক মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির পরিচালক ছিলেন, তার সাথে ভালো সম্পর্ক থাকায় তিনি আমাকে তার কোম্পানীতে জয়েন করতে বলেন।

আমি সেখানে দুই বছর কাজ করি। এরপর কাজ করি ইউনিক গ্রুপে। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য চলে যাই মালয়েশিয়া। এখানে পড়াশুনা শেষ করার পরে সেখানের এক পেট্রোলিয়াম কোম্পানীর একাউন্টেন্ট হিসেবে যোগদান করি। এর পাশাপাশি আমেরিকার অনলাইন এডুকেশন ডিস্ট্যান্স লার্নিং এ পড়াশুনা চালিয়ে যাচ্ছি, বার্মিংহাম নিভোরিয়া গ্লোব ইউনিভার্সিটি থেকে ম্যানেজমেন্ট-এ বিবিএ করেছি। পাশাপাশি ইউরিপিয়ান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মালয়েশিয়া শাখা থেকে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিভাগে মাস্টার্স করছি।

প্রশ্ন : আপনার পেশাগত জীবনের টার্নিং পয়েন্ট কোনটি ?

মেহেদী হাসান : জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে গেলে সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে একবারেই কেউ উঠতে পারে না, সেজন্য পারিশ্রম লাগে। পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি- কথাটা একেবারেই খাঁটি কথা। সব মানুষের জীবনে উত্থান-পতন থাকবেই। আমার জীবনেও ছিলো। আমি ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম, সেজন্য পড়াশুনা করেছি সায়েন্সে। পরে যখন ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ভর্তি হলাম, ভাবলাম ভালো একজন ইঞ্জিনিয়ার হবো। সেটাও হয়ে ওঠেনি। বিজনেসে সফলতা পেয়েছিলাম, তাই একাউন্টেন্ট হিসেবে আছি।

প্রশ্ন : আমরা জেনেছি আপনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে আরপি ফাউন্ডেশন নামক একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছেন?  এ উদ্যোগটি কেন নিলেন এবং কাদের জন্য ও এখন পর্যন্ত কি কি কাজ করছেন?

মেহেদী হাসান :  আসলে আমি এ ধরণের কাজগুলোর সাথে সেই ছোটবেলা থেকেই জড়িত। ছোটবেলা থেকেই কোনো মানুষের সামান্য কষ্ট আমাকে খুব পীড়া দিতো। যখন ঢাকায় গেলাম এবং কাজ শুরু করলাম, তখনও আমার ভাবনা যে, মানুষের সেবা করব। পারিবারিকভাবে আমার তেমন অর্থনৈতিক সমস্যা ছিলো না। তাই ঢাকায় উপার্জনের টাকা নিজের কাছেই থাকতো। যখনই সুযোগ পেতাম সেটা কারো উপকারে ব্যয় করার চেষ্টা করতাম।

একটা ঘটনা আমি মনে করতে পারছি, যখন গ্রীন রোডে চাকরি করতাম। অফিস থেকে একদিন হেটে বাসায় ফেরার পথে দেখি একজন মানুষ শীতে কাঁপছে। আমি সেদিন আমার গায়ের জ্যাকেট তাকে দিয়ে দিয়েছিলাম। তাকে সেদিন কিছু টাকা দিয়েছিলাম কাপড় কেনার জন্য। কিছুদিন পরে আবার তার সাথে দেখা। কিন্তু তিনি কিছুই কেনেননি। আমি তখন তার সাথে রাগ না করে নিজে গিয়ে পোশাক কিনে দেই। সেই থেকেই আমার অন্যের দুঃখের সময়ে কাজ করার ইচ্ছাটা আরও প্রবল হয়।

আমার এলাকায় কুড়ালগাছি মাধ্যমিক বিদ্যালয় নামের একটা স্কুল আছে। আমি দেশে থাকাকালীন সময় সেই স্কুলের দশজন বাচ্চাকে নিজের উদ্যোগে বৃত্তি দিতাম। তাদের সারা বছরের স্কুলের বেতন, এক সেট কাপড় এবং বই কেনার টাকা দিতাম। পরে আমি ভেবেছিলাম যে নিজের উদ্যোগে কিছু করলে বোধ হয় আরো ভালো হবে।  সেই জায়গা থেকে আমি এবং আমার কো -ফাউন্ডার রাশিদুল ইসলাম জুয়েল  দুজন মিলেই এই প্রতিষ্ঠানটি শুরু করি। এই প্রতিষ্ঠানে থেকে অনেক কাজ করেছি, ভবিষ্যতে আরো ভালো কিছু করার চিন্তাভাবনা আছে।

প্রশ্ন : বর্তমান অবস্থা ও যেমন চলছে আরপি ফাউন্ডেশন এবং  কিভাবে পরিচালিত হচ্ছে আরপি ফাউন্ডেশন?

মেহেদী হাসান : আরপি ফাউন্ডেশনের পথচলা ২০১৫ সালে। প্রথমে এটা গোপনে চালাতাম। পরে আমাদের মনে হলো যে, অন্যদের এরকম কাজে উদ্বুদ্ধকরণের জন্য হলেও সবাইকে এ প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জানানো দরকার। আমরা এ প্রতিষ্ঠান থেকে যেগুলো কাজ করেছি তা বললে শেষ হবে না। তবে  উল্লেখযোগ্য কয়েকটা আমি বলতে পারি যে, বাংলাদেশের কয়েকটা স্কুলের দরিদ্র ছেলেমেয়েদের সাহায্য করেছি, কাপড় কিনে দিয়েছি, বিভিন্ন উৎসাহ জুগিয়েছি।

আমরা সাহিত্য আড্ডা নামের একটা ক্যম্পেইন শুরু করেছি। এই সাহিত্য আড্ডা হবে প্রতিটা জেলা শহরে যাতে মানুষ সাহিত্যপ্রেমী হয়। আমরা মাদকবিরোধী বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছি, প্রোগ্রাম করেছি। এবং এবারের ফেব্রুয়ারি বইমেলাতে আসছে আরপি ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে বাবুই প্রকাশনী থেকে ফখরুল হাসান এর সম্পাদনায়  বই ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম ভাবনা ৭১ ‘।

আগামী দিনের জন্য আমরা বেশ কিছু বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি, এবং সে লক্ষ্যে কাজ করছি।

প্রশ্ন :  ভবিষ্যৎ পথচলায় আপনাদের ভাবনা কি?

মেহেদী হাসান : ভবিষ্যৎ পথচলায় কিছু প্রধাণ লক্ষ্য নিয়ে আমরা এগুচ্ছি। যেমন,  গরীব,অসহায়, দুস্থ দের মাঝে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ঐষধ বিতরণ। স্কুল গুলোতে ডিজিটাল শিক্ষা বৃদ্ধিকরণে ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণ প্রেরণ। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা ও খাবার, চিকিৎসা নিশ্চিত করা৷ দেশের কবি,সাহিত্যিক, লেখক তথা গুণীজন দেরকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান৷ সাহিত্য বিস্তারে কাজ করা৷ মাদকবিরোধী ক্যাম্পেইন করা৷ হতদরিদ্র ও বেকারদেরকে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। মেধাবী, গরীব শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিতকরণ ও বৃত্তিপ্রদান। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণে সরকারের সাথে কাজ করা বা সরকারকে সাহায্য করা।  দক্ষ জনশক্তি তৈরীতে যুকদেরকে কর্মমুখী প্রশিক্ষণ দেওয়া৷ শিক্ষিত ও যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তোলা। আমরা এ লক্ষ্যগুলোকে সামনে রেখে কাজ করছি।

প্রশ্ন : যদি বলা হয় আপনার জীবনের বড় অর্জন গুলো কি কি?

মেহেদী হাসান : জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হল- দেশ ও দেশের মানুষের জন্য কিছু করতে পারছি, ভবিষ্যতে কিছু করার চেষ্টা করছি। এবং এখন মহান আল্লাহ তা’লা আমাকে সে সুযোগ দিয়েছেন। মানুষের জন্য কিছু করার বিনিময়ে পেয়েছি মানুষের অনেক অনেক বেশী ভালবাসা ও দোয়া৷ এটা নিয়েই সামনের পথে চলতে চাই।

প্রশ্ন : সফলতার কথা বললেন,  কোন ব্যর্থতা?

মেহেদী হাসান :  জীবন আমাকে ব্যর্থতা শিখিয়েছে নাকি আমার জীবনই ব্যর্থ, আমি সে বিতর্কে যেতে চাই না। কারণ আমার জীবনে খুব বেশি ব্যর্থতা নেই আর আমি ব্যর্থতা মনেও করতে চাই না। কারণ আমি একজন ইতিবাচক মানুষ, এবং ইতিবাচিক ভাবনা ভাবতেই পছন্দ করি। মানুষের জীবনে আকাঙ্ক্ষা অনেক। মানুষের চাওয়া পাওয়ার পরিধি অনেক বেশি, আমরা যা-না তার চেয়ে অনেক বেশি চাই। চাওয়া-পাওয়ার অমিলের কারণেই ব্যর্থতার প্রশ্নটা চলে আসে। আমার জীবনের যে ছোটখাটো ব্যর্থতা ছিলো আমি সেগুলো থেকেই শিক্ষা নিয়েছি, চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছি। তাই আজ উত্তরণের পথও পেয়ে গেছি।

প্রশ্ন : জীবনের স্মরণীয় কোন ঘটনা,  যা ভেবে আজও রোমাঞ্চিত হোন?

মেহেদী হাসান :  জীবনে অনেক স্মরণীয় ঘটনা আছে। যেমন, ঘটনাটা ২০০৮ সালের দিকে ঢাকায় থাকার সময়। আমার একটা শখ হলো, বই কেনা এবং বই পড়া। সেবার বইমেলায় গেছিলাম। গিয়ে দেখা হলো লেখক হুমায়ুন আহমেদের সাথে। তিনি সেদিন আমাকে কাছে ডেকে অনেকক্ষণ কথা বলেছিলেন। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমি কতগুলো বই কিনেছি। আমি তাকে বললাম যে, প্রায় একশ বই কিনেছি বইমেলা থেকে। তিনি আমাকে দেখে আশ্চর্য হয়ে গেছিলেন তিনি। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দিয়েছিলেন। সেই স্মৃতিটা আমি ভুলতে পারবো না কখনও।

প্রশ্ন : পাঠকদের জন্য কিছু বলুন।

মেহেদী হাসান : আমি মনে করি পাঠকরা হচ্ছেন আমাদের মতো ক্ষুদ্র লেখক এবং আমরা যারা সামাজিক কার্যক্রম করি তাদের কাছে সর্বশ্রেষ্ঠ। পাঠকরাই হচ্ছে শক্তি। কারণ পাঠক না হলে কোনো বই লিখে কাজ হতো না। আর এখন বইমেলা চলছে। আমি পাঠকদের বলবো, দৈনন্দিন জীবনের কিছু খরচ বাঁচিয়ে হলেও বই কিনুন। কারণ বই মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ বন্ধু। বই কিনে কেউ ঠকে না। আর আমাদের আরপি ফাউন্ডেশনের পাশে থাকবেন, যেন আমরা আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারি।

1 COMMENT

আপনার মন্তব্য :

Please enter your comment!
Please enter your name here