কর্মই মানুষকে বাঁচতে শেখায়

0


Published : ২৭.০৪.২০১৮ ০১:৩১ অপরাহ্ণ BdST


এইচ. এম নুর আলম


কর্ম এমন একটি বৃত্তি যা মানুষকে বাঁচতে শেখায়, কন্টকাকীর্ণ পথকে করে সহজ-সুগম। মানুষের কর্মস্পৃহাই মানুষকে দীর্ঘদিন আনন্দের সঙ্গে বাঁচিয়ে রাখে। কর্মোদ্দমী মানুষ নিরানন্দে ভোগেনা। কাজের স্পৃহাই তাকে সামনে এগিয়ে যাবার পথ দেখায়, স্বপ্ন বুনতে সাহায্য করে। কর্মোদ্দমী মানুষ পরনির্ভরশীলতার উপর জেঁকে বসেনা। সে কর্মের মধ্যে খোঁজে আনন্দ, স্বীয় এবং অপরের তৃপ্তিবোধ আর সে সাহসিকতার অবাধ্য নাবিক।

একজন কর্মস্পৃহা মানুষ তার কর্মকে সব সময় সম্মানের চোখে দেখে। নিজের উপর বিশ্বাস হারায়না। কারণ, নিজের উপার বিশ্বাস হারানো যে পাপ। প্রাবন্ধিক ও সাহিত্যিক ডা. লুৎফর রহমান তাঁর ‘শ্রেষ্ঠ রচনাসমগ্র’ তে ‘কাজ’ নামক লেখায় বলেছেন, কাজের (কর্মের) মাধ্যমেই মানব জীবনের সুখ ও কল্যাণ নিহিত। অলস ব্যক্তিরা আর যাই হোক নিজের ধ্বংস নিজেই ডেকে আনে। কর্মোদ্দমী মানুষ কখনোই অন্যায় পথে পা বাড়ায় না, বাড়ানোর সুযোগ একেবারেই কম। কারণ, তাদের চিন্তা-চেতনায় শুধু কাজই উপস্থিত থাকে, থাকে মানুষের কল্যাণের ধর্মচর্চা। কিন্তু অলস মানুষের মাথায় সব সময় কু-চিন্তা ভর করে থাকে। কর্মের অভাবে অমঙ্গল ভর করে তার কাঁধে। কথায় আছে- ‘অলস মস্তিস্ক শয়তানের কারখানা।’

কর্ম মানুষকে মহীয়ান করে তোলে। বাড়িতে পেশাদার লোক থাকলেও মাঝে মাঝে নিজের কর্মটা নিজেই করতে হয়। এতে যেমন আনন্দ পাওয়া যায় তেমনি কর্তব্যবোধও সৃষ্টি হয় নিজের মধ্যে। কর্ম দিয়েই সফলতা অর্জন করা যায়। কর্ম ছাড়া সুখ মেলেনা। কর্মে সাময়িক কষ্ট আর বাধা থাকলেও সেটি জয় করা সম্ভব আপনস্পৃহা দিয়েই। কর্ম না করলে বাধা আসবেনা আর বাধা না আসলে সফলতা অর্জন করা যায়না। এই বাধাকে জয় করাই কর্মপ্রেমিদের অবশ্য কর্তব্য। বাঙালি স্বনামধন্য কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার বলেছেন- ‘কাটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে/দুঃখ বিনা সুখ লাভ হয় কি মহিতে?’। কবি এখানে বুঝাতে চেয়েছেন, তুমি কোনো কর্ম করতে বা কাজের সফলতা অর্জন করতে গেলে অবশ্যই কাাঁটার মতো বাধা আসবে। কিন্তু সেই বাধা অতিক্রম করলেই কেবল সুখ পাওয়া যাবে।

কাজের প্রতি আন্তরিকতা, সাধনা আর বিশ্বাস যোগ করতে হবে। আপনি যে কর্ম করছেন সেটার মাধ্যমে অবশ্যই সফলতা অর্জন করবেন-এ রকম বিশ্বাস থাকতে হবে। কোনো কাজের প্রতি আন্তরিকতার অভাব হলে সেটি সম্পূর্ণরুপে সফল হয়না। সাধনাই আপনাকে সফলতার দ্বার উন্মুক্ত করে দিবে। কাজের প্রতি গভীর মনোযোগ আর ভালবাসা আপনার দায়িত্বটাকে মজবুত করে, ভালবাসতে বাসতে শেখায় অন্যের কাজকেও। কর্তব্যবোধ জাগিয়ে তোলে নিজের এবং অপরের প্রতি।

কর্ম- সেটি যে কোনো ছোট পেশাই হোক-অবমূল্যায়ন করবেন না। কর্মের প্রতি সম্মান, ভালবাসা, আন্তরিকতা, মনোযোগ আপনার সফলতার সিঁড়িকে অনেক দেরিতে হলেও উচ্চাসনে নিয়ে যাবে। আপনাকে করবে মহৎ-মহান খ্যাতিমান ব্যক্তি আর জীবনকে করবে সদা আনন্দময়, উল্লাসিত।

কর্ম মানুষকে সফল হবার, অনেক বড় হবার স্বপ্ন দেখায়। সেটি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে হয়না। কর্ম যেমন মানুষকে বড় হবার স্বপ্ন দেখায় তেমনি আপনার সত্যিকার স্বপ্ন দেখা আপনার উদ্দমকে বলিষ্ঠ করে, অন্য ব্যক্তিরাও কর্মস্পৃহায় উৎসাহী হয়। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এপিজে আব্দুল কালাম বলেছিলেন, তুমি যেটা ঘুমিয়ে দেখো, সেটা স্বপ্ন নয় বরং স্বপ্ন সেটাই যা তোমাকে ঘুমাতে দেয়না।’ স্বপ্ন এমন জানিস যা মানুষকে কর্মের প্রতি জোর তাগিদ দেয় ভবিষ্যৎ বুননে। কর্মের মাঝেই স্বপ্নের বসবাস আর স্বপ্নের মাঝেই কর্মস্পৃহার সফলতার সিঁড়ি উদ্ভাসিত হয়, যাকে পাবার জন্য মানুষ তাড়িত হয়ে ঘুরে বেড়ায়। যে জাতি আলস্য শয়নে স্বপ্ন বুনতে চায়, নিজে কাজ না করে পরনির্ভরশীল হয়, সে জাতির কপালে ভাগ্যের বিড়ম্বনা হাঁক দিয়ে যায়। পচন ধরে তার মননে, শরীরে এবং চিন্তা- চেতনায়।

অন্য জাতির চেতনার চেয়ে বাঙালি জাতির চেতনা সমুন্নত হলেও কর্মস্পৃহা খুবই দুবৃল, কেবল পরনির্ভরশীলতা ভাব। অনেক সময় কর্ম না করে কেবল অন্যের সর্বনাশ কষতে থাকি। এদিকে নিজের খাতায় যে রাশি রাশি শুন্য পড়েছে সে হিসাব কষবার সময় নেই। এ কষ্টটাকে বুকে নিয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘বাঙালি মোরা ভদ্র অতি পোষমানা এ প্রাণ/ বোতাম আটা জামার নিচে শান্তিতে শয়ান।’ বাঙালি আমরা স্বাধীন কর্ম না খুঁজে, নিজের উদ্ভাবনী শক্তিটাকে কাজে না লাগিয়ে বছর বছর ধরে সময় অপচয় করি শুধু রাষ্ট্রের চাকুরি পাবার প্রত্যাশায়। এতে সময় ও অর্থ দুটোই অপচয় হচ্ছে সমানভাবে, তবে সে দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই আমাদের। এ অবস্থায় বসে নেই কর্মোদ্দমী মানুষগুলো। তারা সময়কে কাজে লাগাতে চায়, ছোট-বড় যে কোনো কাজ- কোনোটাকেই অবহেলা করেনা-সম্মান করে।

জীবনের মানে বুঝতে আপনাকে অবশ্যই কর্মশীল মানুষ হতে হবে। কায়িক কর্ম থেকে দূরে থাকা মানুষের মনে-মননে-শরীরে ঘুন ধরে, জীবনের অর্থটাকে করে পরনির্ভরশীল- অবাঞ্ছনীয়। আশাহত করে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎকে। প্রতিটি ধর্মও মানুষকে কাজের উৎসাহ দিয়েছে। আপনি যদি ¯্রষ্টাকে খুশি করার নিয়তে যে কোনো কর্ম যেটা ভালো, কল্যাণময় করেন সেটি আপনার ইবাদতের মধ্যে গণ্য হবে-এমনকি পরিবারের জন্য অর্থ উপার্জনও।

জুতো সেলাই, কাপড় কাঁচা, চুল কাটা, ময়লা পরিস্কার করা-এগুলোও একেকটি কর্ম। যারা এগুলো করেন তারা সমাজের চোখে নি¤œমানুষ হলেও পেশা যে মহৎ এটি মহান সত্য। সামান্য কাজ হলেও সে পেশার সম্মান সবাইকে দেওয়া কর্তব্য। পেশার অসম্মান অন্যায়, পাপ, জঘন্য মানসিকতার।

কর্ম মানুষকে মহৎ করে, জীবনকে করে ব্যঞ্জনাময়, স্বপ্নকে শানিত, চলার পথকে করে সহজ-সুগম ।

আপনার মন্তব্য :

Please enter your comment!
Please enter your name here