জিয়া উদ্দিন মাহমুদ’র লিডারশীপ ভাবনা

0


Published : ১৯.০২.২০১৯ ১০:২১ পূর্বাহ্ণ BdST

বর্তমান সময়ে এই দুনিয়াটাকে বলা যায় ‘কর্পোরেট দুনিয়া’। প্রাযুক্তিক বিপ্লবের সাথে সমানতালে তাল মিলিয়ে প্রসার ঘটছে এই কর্পোরেট দুনিয়ার। মানুষ চাকরির বাজারে প্রবেশের আগে যেমন যুদ্ধ করেন, তেমনই আরেক যুদ্ধ শুরু হয় চাকরির পরে। সেই যুদ্ধই মূলত টিকে থাকার যুদ্ধ, এগিয়ে যাওয়ার যুদ্ধ।


যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়া যুদ্ধে নামাটা যেমন হারের কারণ হতে পারে, তেমনই যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়া কর্পোরেট দুনিয়ায় প্রবেশ করাতেও ওঠে অস্তিত্বের প্রশ্ন। বাংলাদেশ অর্থনীতিতে এগিয়ে গেছে অনেকটা পথ। উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাতে পারবে এ দেশ, যদি আমরা অর্থনীতিতে নিশ্চিত করতে পারি দক্ষ কারিগর। এই দক্ষ কারিগর তৈরির জন্য কর্পোরেট ট্রেনিংয়ের বিকল্প নেই কিছুই।

কর্পোরেট ট্রেনিংয়ের একাল-সেকাল, খুঁটিনাটি এবং এটি নিশ্চিতকরণে আমাদের করণীয় এবং বাংলাদেশে কর্পোরেট ট্রেনিং  ও লিডারশীপগত উন্নয়ন সম্পর্কিত নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা হয় কর্পোরেট ট্রেইনার  ও কনসালটেন্ট  জিয়া উদ্দিন মাহমুদ – এর সাথে। তার অভিজ্ঞতা বর্ননা ও পরামর্শ নিয়েই  আজকের সাক্ষাৎকার।


সাক্ষাৎকার নিয়েছেন : আরেফীন দিপু 


প্রশ্ন : শুরুতেই জানতে চাই আপনার ছেলেবেলার গল্প  ও আপনার  ক্যারিয়ারের যাত্রা শুরুর  সম্পর্কে ?

জিয়া উদ্দিন মাহমুদ : আমার জন্ম ফেনিতে। বাবার চাকরির সুবাদে আড়াই বছর বয়সে আমার কুমিল্লায় আসা। কুমিল্লা জিলা স্কুলে এইচএসসি পর্যন্ত পড়াশুনা করি। এরপর আইটিতে এক বছর মেয়াদী একটা ডিপ্লোমা করি। তারপর ২০০২ সালে চলে আসি ঢাকায়। আমার ক্যারিয়ার জীবনের শুরু সেখানেই। ছোট বেলার কথা বলতে গেলে ছাত্র জীবনের কথা বলতে হয়। আসলে, একাডেমিক দিক থেকে বিবেচনা করলে ছাত্র হিসেবে আমি কখনও খুব ভালো ছাত্র ছিলাম না। আমার পড়াশুনা ছিলো পাশ করার জন্য। আমার ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছে বা ঝোঁক বেশি ছিলো কর্মমুখী শিক্ষার প্রতি। সেজন্যই আমি আইটিতে ডিপ্লোমা করি, এবং নিজেকে একজন আইটি প্রফেশনালস তৈরির চেষ্টা করতে থাকি। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো তখন আমাদের দেশে আইটির এতোটা গুরুত্ব ছিলো না। অনেক চাকরির চেষ্টা করার পরে আমি একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে আইটি অফিসার হিসেবে জয়েন করি। আমার ক্যারিয়ারের শুরু এখানেই। এরপর মালয়েশিয়াতে ৫ বছর জব এবং দেশে সব মিলিয়ে ৭ টি নামকরা কোম্পানীতে, সবমিলিয়ে  দীর্ঘ ১৫ বছর  কাজ করেছি।

প্রশ্ন : বর্তমানে কোন উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছেন?

জিয়া উদ্দিন মাহমুদ : দীর্ঘ ১৬ বছর চাকরি করার পরে এখন আমার মনে হয়েছে, আমি নিজেরই এখন  একজন উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করার সময় এসে গেছে। সেই সাথে দক্ষ উদ্যোক্তা তৈরির জন্য ট্রেনিং এবং কোচিং করানো আমার একটা আলাদা পছন্দের জায়গা। বর্তমানে আমি একজন স্বাধীন উদ্যোক্তা হিসেবে বিজনেস কনসালটেন্সি, কোচিং, এবং মেন্টরিং-এর কাজ করছি। পাশাপাশি বিভিন্ন কর্পোরেট কোম্পানীতে লিডারশিপ ট্রেনিং বা অন্যান্য স্পেশাল ট্রেনিংগুলো পরিচালনা করছি। এর সাথে আমার নিজের একটা কনসালটেন্ট প্রতিষ্ঠান আছে সেটার সিইও হিসেবে আছি। এছাড়াও ‘ফিউচার লিডারস এলায়েন্স’ নামের একটা প্রতিষ্ঠান আছে সেটার পরিচালক এবং কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করছি৷ এই পুরো সময়টাই আমার উদ্যোক্তা জীবন; চাকরি নয়।

প্রশ্ন : বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কর্পোরেট ট্রেনিং এর গুরুত্ব কতটুকু?

জিয়া উদ্দিন মাহমুদ : বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কর্পোরেট ট্রেনিং এর গুরুত্ব সম্পর্কে বললে, আমি বলব এখনই উপযুক্ত সময়। যেহেতু বাংলাদেশ ধীরে ধীরে উন্নত অর্থনীতির দিকে এগুচ্ছে।  বিশ্বায়নের এই সময়ে আন্তর্জাতিক মাঠে সঠিকভাবে এগিয়ে চলার জন্য আমাদের দক্ষ জনবলের বিকল্প অন্য আর  কিছু নেই। আর দক্ষ জনবল তৈরির অন্যতম পূর্বশর্ত হলো স্কিল ডেভেলপমেন্ট। এই স্কিল ডেভেলপমেন্ট হলো একাডেমিক স্কিলের বাইরের যে স্কিল, সেটাই। একটা কথা খুবই প্রচলিত যে, কোনো কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের জন্য ১৫ শতাংশ প্রভাব পড়ে হার্ড স্কিলের, এবং বাকি ৮৫ শতাংশই হলো সফট স্কিলস তথা ব্যবহার, কথা-বার্তা, ইত্যাদি। এগুলো বিবেচনা করলে বাংলাদেশে কর্পোরেট ট্রেনিং আরও অনেক বেশি বাড়ানো দরকার।

প্রশ্ন : এ খাতের জন্য এই মুহূর্তে বড় চ্যালেঞ্জ কি?

জিয়া উদ্দিন মাহমুদ : কর্পোরেট ট্রেনিংয়ের এই মুহূর্তে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বাংলাদেশের কোম্পানীগুলো কর্পোরেট ট্রেনিংকে এখনও শুধুই ব্যয় হিসেবে দেখে, এতেও যে লাভ আছে, সেই লাভটা তারা দেখতে পায় না। যদিও মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো এ বিষয়টি থেকে বেড়িয়ে আসতে পেরেছে, এবং তারা বিভিন্ন কর্পোরেট ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করছে। কিন্তু বেশিরভাগ কোম্পানিই এটাকে শুধুই ব্যয় হিসেবে দেখে। কিন্তু আমার মনে হয়, প্রত্যেক কোম্পানিরই উচিৎ তাদের কর্মীদের থেকে সর্বোচ্চ আউটপুট বের করে আনার জন্য বেশি বেশি কর্পোরেট ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করা। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এটাই যে, কর্পোরেট ট্রেনিংয়ের বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা। আর  এই সচেতনতা তৈরির জন্য সরকার, বিভিন্ন সংগঠন এবং এই সেক্টরে কাজ করে এমন ব্যক্তিদের এগিয়ে আসা উচিৎ।

প্রশ্ন : এ খাতের মত একটি চ্যালেঞ্জিং উদ্যোগ নিয়ে আগ্রহী হলেন কেন?

জিয়া উদ্দিন মাহমুদ : সবার আগে একটা কথা হলো কোনো একটা কাজের প্রতি আগ্রহ। যখন কোনো মানুষের একটা কাজের প্রতি বিশেষ আগ্রহ থাকে, এবং সেই কাজটি করতে সে ভালোবাসে তখন সে যেকোন চ্যালেঞ্জকেই মোকাবেলা করতে পারে। আমি এখন এটাকে আর চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখি না; আমি দেখি একটা বড় ধরণের সুযোগ হিসেবে। যেহেতু বাংলাদেশে মার্কেটটা কেবল বেড়ে উঠছে, সুতরাং এখনই সঠিক সময় এই মার্কেটকে বিস্তৃত করার। সেই জায়গা থেকেই আমার এই কর্পোরেট ট্রেনিংকে পছন্দ করে নেয়া।

প্রশ্ন : কর্পোরেট ট্রেনিং দেয়ার ক্ষেত্রে কোন পক্ষ বেশি আগ্রহ দেখায় প্রতিষ্ঠান নাকি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা? আর এই ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা কারা করে থাকে?

জিয়া উদ্দিন মাহমুদ : কোন পক্ষ বেশি আগ্রহ দেখায়, এটা আলাদা করে বলা খুব কঠিন। তবে একটা কথা বলা যায় যে, এখন পর্যন্ত কোম্পানিগুলোই কর্পোরেট ট্রেনিংয়ের ক্ষেত্রে মূল আগ্রহটা দেখাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা এর ব্যক্তিগতভাবে এর গুরুত্ব হয়তো এখনও বুঝতে পারেনি সেভাবে।

প্রশ্ন : বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠানগুলোর ও তার কর্মীদের জন্য  প্রফেশনাল ট্রেনিংয়ের  প্রয়োজনীয়তা কতটুকু বলে আপনি মনে করেন?

জিয়া উদ্দিন মাহমুদ : বর্তমান প্রেক্ষাপটে কর্পোরেট ট্রেনিংয়ের বিকল্প নেই বললেই চলে। কারণ, আমরা নলেজ ইকোনোমির দিকে আগাচ্ছি, আমাদের টেকনোলজিক্যাল এডভান্সমেন্ট হচ্ছে, অনেক রকমের প্রযুক্তির আবির্ভাব হয়েছে এবং উন্নতি হচ্ছে। এই জায়গাগুলে বিবেচনা করলে নতুন নতুন স্কিল ডেভেলপমেন্টের কোনো বিকল্প নেই। শুধুমাত্র একাডেমিক পড়াশুনা করে প্রফেশনাল লাইফে সফল হওয়াটা খুবই কঠিন। এজন্য প্রফেশনাল ট্রেনিংয়ের অন্য কোন বিকল্প নেই। অনবরত ট্রেনিং দরকার, আলাদাভাবে দু’একটি ট্রেনিং দিয়ে হবে না। প্রত্যেক কোম্পানির বার্ষিক বাজেটের একটা অংশ থাকতে হবে কর্পোরেট ট্রেনিংয়ের জন্য।

প্রশ্ন : ভবিষ্যৎ পথচলায় আপনার ভাবনা কি?

জিয়া উদ্দিন মাহমুদ : আমার ভবিষ্যৎ ভাবনা হলো, আমি ইন্ডাস্ট্রির সাথে থাকতে চাই। আমি চাই যে আমাদের যারা অন্যান্য কর্পোরেট ট্রেনার আছে, তাদের সাথে একই প্ল্যাটফমে কাজ করে আমরা যেন প্রতিষ্ঠিত করতে পারি যে, কর্পোরেট ট্রেনিংয়ের কতোটা দরকার। যেকোনও একটা বিজনেসে ভাল করতে গেলে শুধুমাত্র প্রোডাক্ট আর টাকা হলেই ভাল করা সম্ভব না, এর জন্য প্রয়োজন সব ক্ষেত্রেই দক্ষতা অর্জন করা। সেজন্যই আমার ভাবনা হলো, লার্নিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট ইন্ডাস্ট্রির জন্য কাজ করা, সচেতনতা তৈরিতে সাহায্য করা।

প্রশ্ন : নতুনরা কর্মক্ষেত্রে যোগ দেওয়ার আগে নিজেদের কিভাবে তৈরি করতে পারে?

জিয়া উদ্দিন মাহমুদ : এখানে  বলতে গেলে ঘুরেফিরে যেতে হয়, প্রফেশনাল ট্রেনিংয়ের কথায়। এক্ষেত্রে দুইটা ধাপে এই ট্রেনিং হতে পারে, প্রথমত, কোম্পানিগুলোর ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা, দ্বিতীয়ত ব্যক্তিগত উদ্যোগে ট্রেনিং গ্রহণ করা। যেকোনো কর্পোরেট জায়গায় প্রবেশের আগে অন্তত কর্পোরেট কালচার সম্পর্কে ধারণা থাকাটা খুবই জরুরী। প্রত্যেকটা ডিপার্টমেন্ট কিভাবে কাজ করে তার বেসিক ধারণা থাকা দরকার। একটা ইন্টারভিউ ফেস করতে গেলে নিজেকে কিভাবে স্মার্টভাবে প্রেজেন্ট করা যায় সেই বিষয়ে জ্ঞান থাকা দরকার। এক্ষেত্রে কর্পোরেট লাইফে ভালো কিছু করার জন্য, মেন্টর বা সিনিয়রদের কাছ থেকে পরামর্শ নিতে পারে। এজন্য পড়াশুনা করা দরকার প্রচুর। অনলাইনে এ বিষয়ক অনেক লেখালেখি হয়, এসব থেকেও অনেক কিছু জানা যাবে। কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের আগে সেখানে কী কী ধরণের চ্যালেঞ্জ, সুযোগ-সুবিধা, বাধা বিপত্তি বা পলিসি থাকতে পারে সেগুলো সম্পর্কে জ্ঞান নেয়াটা জরুরী। আর এজন্য সঠিক গাইডলাইন পাওয়ার জন্য একজন মেন্টর বেছে নেয়া জরুরী। কর্পোরেট জায়গায় যাওয়ার আগে যেকোনও মেন্টরিং বা কোচিং তাকে অনেকধাপে এগিয়ে রাখবে।

আপনার মন্তব্য :

Please enter your comment!
Please enter your name here