তারুণ্যের স্বপ্নের বাংলাদেশ

0


Published : ০৯.১২.২০১৮ ০৯:২৪ পূর্বাহ্ণ BdST

ড. আতিউর রহমান


বাংলাদেশ তারুণ্যের প্রতীক। তরুণরাই এনেছে এদেশ। বেশিরভাগ মুক্তিযোদ্ধাই ছিলেন বয়সে ও মননে তরুণ। মূলত গ্রাম থেকে আসা কৃষক সন্তান এরা। তাদের নেতৃত্ব দিয়েছেন গ্রাম থেকে উঠে আসা মনে প্রাণে তরুণ আমাদের জাতির পিতা। তরুণ বয়সে ছাত্রলীগ গঠন করে তিনি তরুণদের সাথে যে আত্মার আত্মীয়তা গড়ে তুলেছিলেন সে বন্ধন তাঁর আমৃত্যু কাটেনি। 


আওয়ামী লীগ গঠন করা, ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া, চুায়ান্নর যুক্তফ্রন্টের জন্য ভোট চাওয়া, সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী আন্দোলন, ৬-দফা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে ঊনসত্তরে মূলত: তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে মুক্তি পাওয়া এবং তরুণদের কাছ থেকে বঙ্গবন্ধু উপাধি গ্রহণ করা ছিল তাঁর বর্ণীল রাজনৈতিক জীবনের প্রধান এক পর্ব। এরপর তরুণ ও সহনেতাদের সাথে নিয়ে সত্তরের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ছ-দফার পক্ষে মেন্ডেট গ্রহণ, পাকিস্তানী ষড়যন্ত্রকারীদের সেই নির্বাচনী ফলাফল অস্বীকার এবং একাত্তরের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনের সূত্রপাত, ঐতিহাসিক মার্চে মুক্তির ডাক এবং শেষ পর্যন্ত গণহত্যার প্রেক্ষাপটে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের যে সূচনা তিনি করেছিলেন তাতেও তরুণরাই ছিল তার নির্ভরতার প্রতীক। এই তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর এক জরিপে (বিআইডিএস, ১৯৯১) আমরা জানতে পারি যে এদের ৬০ শতাংশেরও বেশি ছিল ছাত্র। ৮৩% শতাংশের বয়স ছিল ২৯ বছরের নীচে। গড় বয়স ২৩ বছরের মতো।

মুত্তিযোদ্ধাদের ৮৫ শতাংশেরও বেশি এসেছিল কৃষক পরিবার থেকে। এদের ৮৭ শতাংশই ছিল স্বল্প থেকে উচ্চ শিক্ষিত। স্নাতকোত্তর ছিল মাত্র ৩.১৪%। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে তারা প্রায় সবাই মাতৃভূমির স্বাধীনতা বললেও, শোষণমুক্ত সমাজের কথা বলেছেন ৯১%। স্বার্থান্বেষী মহল উচ্ছেদের কথা বলেছেন ৭১%। আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচার কথা বলেছেন ৭৯% এবং একটি উন্নত জাতি প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন ৬৯%।

এমন প্রতিকূল পরিবেশেও এই তরুণরা যে উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন তার মূলে ছিল বঙ্গবন্ধুর ‘সোনার বাংলা’ গড়ার স্বপ্ন। তিনি এই স্বপ্নের বীজ দেশবাসীর, বিশেষ করে, তরুণদের অন্তরে নিরন্তর বপণ করে গেছেন। তাই মূলত: তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনপণ যুদ্ধের ফসল স্বাধীন বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা হবার আগক্ষণে দিল্লীর পালাম বিমানবন্দরে ১০ জানুয়ারি, ১৯৭২ উচ্চারণ করেছিলেন, ‘অবশেষে আমি নয় মাস পর আমার স্বপ্নের দেশ সোনার বাংলায় ফিরে যাচ্ছি। …আমি ফিরে যাচ্ছি তাদের নিযুত বিজয়ী হাসির রৌদ্রকরে। আমাদের বিজয়কে শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির পথে পরিচালিত করার যে বিরাট কাজ এখন আমাদের সামনে, তাতে যোগ দেওয়ার জন্য আমি ফিরে যাচ্ছি আমার মানুষের কাছে।’ (টাইমস অব ইন্ডিয়া, নয়াদিল্লী ১৩ জানুয়ারি, ১৯৭২)।

কাল বিলম্ব না করে তিনি ধ্বংসস্তুপ থেকে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার কাজে লেগে পড়েন। ২৬ মার্চ ১৯৭২ উপলক্ষে জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে তাই তিনি উচ্চারণ করেন, “আমি ভবিষ্যৎ বংশধরদের সুখী ও উন্নততর জীবন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।” (মোনায়েম সরকার সম্পাদিত বাঙালির কণ্ঠ, আগামী প্রকাশনী, ১৯৯৮, পৃ. ২৮১)।

নতুন করে সোনার বাংলা গড়ে তোলার সেই প্রতিশ্রুতি তিনি আমৃত্যু অক্ষরে অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করেছেন। মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ ‘শ্মশান বাংলা থেকে সোনার বাংলায় রূপান্তরের’ এক যুগসন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছিলো। ঠিক যখন বাম্পার আমন ফলনের সোনালী হাতছানি তিনি দেখতে যাচ্ছিলেন সেই সময়েই আচমকা আঘাত হানে একদল ষড়যন্ত্রকারী। এভাবেই এদেশের তরুণ সমাজকে নিরাশার সাগরে ভাসিয়ে তাঁকে তাঁর দেশবাসীদের কাছ থেকে শারীরিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হলো। এরপর তাঁর প্রিয় স্বদেশ চলতে থাকে অন্ধকারের দিকে। তবে তরুণরা বসে ছিল না। তারা ফের প্রতিরোধ গড়ে তোলে। দীর্ঘ সংগ্রাম শেষে তাঁর সুযোগ্য কন্যার হাত ধরে দেশ আবার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথে ফিরে আসে ১৯৯৬ সালে। তবে সে যাত্রা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ২০০১ সালে দেশ আবার চলতে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী এক অনিশ্চিত হাতাশার পথে। অনেক ত্যাগ তীতিক্ষার পর ২০০৯ সাল থেকে দিনবদলের আশায় স্বদেশ আবার পরিচালিত হতে থাকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথে। এবারেও কা-ারি তাঁর সুকন্যা শেখ হাসিনা। এরপর প্রায় এক দশক পেরিয়ে বাংলাদেশ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের এক শক্ত পাটাতনের ওপর দাঁড়িয়েছে। এই দশকের উন্নয়ন অভিযাত্রার সুফল দেশবাসী ভালোভাবেই পেতে শুরু করেছে। এই সময়কালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়েছে লাগাতারভাবে ছয় শতাংশের বেশি হারে। সর্বশেষ গত বছরে তা ৭.৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। চলতি বছর তা আটশতাংশের গন্ডিতে প্রবেশ করবে বলে আশা করা যায়। ভারত বর্তমানে বাড়ছে ৭.১ শতাংশ হারে।

এই এক দশকে দারিদ্র্য কমে আগের চেয়ে অর্ধেকে নেমেছে (২২%)। বিনিয়োগ, ভোগ ও মাথাপিছু বেড়েছে তিনগুনেরও বেশি। গড় আয়ু বেড়েছে প্রায় নয় বছর। এখন তা ৭৩ বছর। ভারত ও উন্নতিশীল বিশ্ব থেকে ৪ বছর বেশি। খাদ্যে আমরা এখন স্বয়ং সম্পূর্ণ। রপ্তানি ৩৭ বিলিয়ন ডলার। রেমিটেন্স ১৫ বিলিয়ন ডলার। বৈদেশিক মুদ্রা পাঁচগুন বেড়ে ৩২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। মূল্যস্ফীতি পাঁচ শতাংশের ঘরে (দশ বছর আগে ছিল ১২%)।এমনি এক প্রেক্ষাপটে এসেছে এ বছরের এই বিজয়ের মাস। এ মাসেই হতে যাচ্ছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এ দেশের তরুণ ভোটাররা। এক হিসেবে জানা যায় ১৮-২৪ বছর বয়সী ২ কোটি ৩১ লক্ষ নতুন ভোটার এবার প্রথমবারের মতো ভোট দেবার সুযোগ পাবে। এরা গত দশ বছর ধরে বর্তমান সরকারের কর্মকান্ড অবলোকন করেছে। এর আগের বিএনপি-জামায়াত সরকারের সুশাসনের ঘাটতি ও দুর্নীতির প্রসারের কথা নিশ্চয়ই তারা জেনেছে। তবে তাদের এ জানা হয়তো অস্পষ্ট। তাই আসন্ন নির্বাচনে এই তরুণদের দৃষ্টি কাড়া খুব সহজ হবে না। তবে আশার কথা যে এদেশের দেশপ্রেম বেশ প্রবল। এদের নব্বই শতাংশেরও বেশি স্বাধীনতার পক্ষে। এরা বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা করে। রাজাকারদের ঘৃণা করে। ‘গণজাগরণ’ মঞ্চের আশা জাগানিয়া মুহূর্তের এরা প্রত্যক্ষ সাক্ষী। তাছাড়া, ‘নিরাপদ সড়ক’ ও ‘কোটা সংস্কার’ আন্দোলনেরও হয় সাক্ষী অথবা সরাসরি অংশগ্রহণকারী। একই সঙ্গে তারা ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ উপকারভোগী। অবাধ তথ্য প্রবাহের অবগাহনের মধ্যে দিয়ে তাদের বেড়ে ওঠা।

নিঃসন্দেহে তরুণরা স্বপ্নচারী। তাদের বেশিরভাগই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি অনুগত ও বিশ্বস্ত। তারা বাংলাদেশের উন্নয়নে উল্লসিত হয়। যেমন তারা উল্লসিত হয় পর্বতারোহী মুহিত ও নিশাতের এভারেস্ট চূড়ায় বাংলাদেশের লাল সবুজের পতাকা ওড়ানোর দৃশ্য দেখে। তারা লাফিয়ে ওঠে বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের দুর্দান্ত পারফরমেন্স দেখে। আনন্দে আত্মহারা হয় মেয়েদের ফুটবল খেলায় জয় করার ঘটনায়। তারা খুশিতে বাকবাকুম করে যখন জানতে পারে মাথাপিছু আয়ের বিচারে বাংলাদেশ পাকিস্তানকে অনেক আগেই পেছনে ফেলে দিয়েছে। আর ভারতের মাথাপিছু আয়ের সমান হবে মাত্র দুবছর বাদেই। তারা খুবই সন্তুষ্ট হয় একথা জেনে যে ভারত তথা উন্নয়নশীল বিশ্ব থেকে বাংলাদেশের নাগরিকরা এখন অন্তত গড়ে চার বছর বেশি বাঁচে। শিশু মৃত্যু ও মাতৃমৃত্যু দুই বিচারেই বাংলাদেশের অবস্থান ভারত তথা উন্নয়নশীল বিশ্বের চেয়ে ঢের এগিয়ে। জেন্ডার সমতার বিচারে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে ৪৭তম। আর দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম। আইএমএফের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৩৪তম (ভারত ৬২তম)।

এইচএসবিসি বলছে ২০৩০ সালে বাংলাদেশ হবে পৃথিবীর ২৬তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। তখন আমাদের অর্থনীতির আকার হবে ৭০০ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে আমাদের অর্থনীতির আকার প্রায় ২৮৫ বিলিয়ন ডলার। বাহাত্তরে তা ছিল মাত্র আট বিলিয়ন ডলার। গত দশ বছর আগেও তা ছিল মাত্র ৯১ বিলিয়ন ডলার। সারা বাংলাদেশের ঘরে ঘরে বিদ্যুত পৌঁছে গিয়েছে। তবু তারা সবুজ শক্তির প্রত্যাশী। জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদের কথা তারা জানে।

প্রায় সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার গড়ে তোলা হয়েছে। এসব কেন্দ্রকে কেন্দ্র করে অসংখ্য ডিজিটাল সার্ভিস বিক্রি করছে হাজার হাজার ই-উদ্যোক্তা। সরকারের ‘এটুআই’ প্রকল্প এক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা পালন করছে। এছাড়া ডিজিটাল সংস্কৃতির অংশ হিসেবে দেশের আনাচে কানাচে পৌঁছে গেছে মোবাইল ব্যাংকিং ও এজেন্ট ব্যাংকিং। অনেকগুলো সফটওয়্যার পার্কও গড়ে উঠেছে। এই ডিজিটাল রূপান্তরের সুফল মূলত: শিক্ষিত তরুণরাই বেশি করে ভোগ করছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের কারিগর এসব তরুণ উদ্যোক্তাদের সৃজনশীল কর্মকান্ডের কারণেই বাংলাদেশের সমাজ ও অর্থনীতি এখন এতোটা গতিশীল হতে পেরেছে।

এতোসব সাফল্য সত্ত্বেও তরুণ প্রজন্ম স্বপ্ন দেখে বাংলাদেশ যেন আরো কর্মমুখর হয়। তবে তারা দেশে শিক্ষিত বেকারত্বের বাড়তি হার দেখে উদ্বিগ্ন। তাই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে বাজারের চাহিদা মতো আরো প্রযুক্তি নির্ভর কারিগরি শিক্ষার দিকে ধাবিত করার তাগিদ তারাই বেশি করে দিচ্ছে। বিশেষ করে, আমাদের প্রবাসী বিজ্ঞানী ও শিক্ষকদের এবং অভিজ্ঞজনদের যুক্ত করে এদেশে বিশ্বমানের প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় গড়তে পারলে নিশ্চয় আমাদের মেধাবী তরুণরা দারুন খুশি হবে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দ্রুত ‘ইনোভেশন ল্যাব ও উদ্যোক্তা তৈরি কেন্দ্র’ স্থাপনের উদ্যোগ নিতে পারলে তরুণরা নিজেরাই অন্যান্য তরুণদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারবে বলে আমাদের বিশ্বাস। সে জন্যে উপযুক্ত অর্থায়নের সুযোগ সৃষ্টি করা অপরিহার্য। আমাদের শিক্ষালয়, এনজিও, ব্যক্তিখাতকে মানব সম্পদ নির্মাণে একযোগে মনোযোগী হতে হবে। যারা প্রবাসে গিয়ে বহু কষ্টে আমাদের জন্য রেমিটেন্স পাঠাচ্ছে তাদের একটু ভাষা শিক্ষা ও খাতভিত্তিক দক্ষতা প্রদান করে উপযুক্ত করে পাঠালে রেমিটেন্স অর্জনে নয়া গতি আসবে। উন্নত দেশ হতে চাইলে দক্ষ জনশক্তি গড়া ছাড়া আমাদের আর কোনো বিকল্প নেই। একইসঙ্গে আমাদের গ্রামগুলোতে শহরের সকল সুযোগ সুবিধে দিয়ে ‘স্মার্ট ভিলেজ’ গড়তে হবে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের গ্রামগুলোতে যথেষ্ট আধুনিক প্রযুক্তি-নির্ভর সুযোগ সুবিধা পৌঁছে গিয়েছে। তা সত্ত্বেও গ্রাম-বাংলায় ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে তরুণ প্রজন্মকে আকর্ষণ করার মতো যথেষ্ট ডিজিটাল রূপান্তরের সুযোগ রয়েছে।

আমি প্রায় সাত বছর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলাম। এই সময়টায় তরুণদের জীবন ও জীবিকার জন্যে সহায়ক হয় এমন অনেক সামাজিক দায়বদ্ধ উদ্যোগ আমরা গ্রহণ করেছিলাম। সিএসআর কর্মসূচির নীতিমালাকে ঢেলে সাজিয়ে শিক্ষা খাতে বড়ো ধরনের বিনিয়োগ করতে ব্যাংকগুলোকে উৎসাহিত করেছিলাম। সিএসআর তহবিলের অন্তত এক তৃতীয়ায়শ বৃত্তি, ল্যাবরেটরি স্থাপন ও শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করার ব্যবস্থা করেছিলাম। চর, হাওর, উপকূলে বসবাসকারীসহ এদেশের প্রান্তজনের ছেলেমেয়েদের উচ্চ শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির জন্যে ব্যাংকগুলোকে সঙ্গে নিয়ে বিপুল সংখ্যক বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা করেছিলাম।

সেই ধারা এখনো চালু রয়েছে। ২০০৯ সালের ৫০ কোটি থেকে ২০১৫ সালে সিএসআর তহবিল ৬০০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছিল। এর এক তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ২০০ কোটি টাকা প্রতি বছর শিক্ষার উন্নয়নে খরচ হয়েছে। বেকার তরুণদের কথা মাথায় রেখে ব্যাংকে চাকুরির আবেদনের সময় ব্যাংক ড্রাফ্ট, পে-অর্ডারসহ সকল ফি নিষিদ্ধ করেছিলাম। চাকুরি নেই। নিজেদের থাকা খাওয়াই অনিশ্চিত। চাকুরির আবেদনের জন্য মোটা অংকের টাকা তারা কোথা থেকে পাবে?

এরকম অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। সেসবের তথ্য দিয়ে পাঠকদের আর ভারাক্রান্ত করতে চাইনা। শুধু এইটুকু বলতে চাই যে তরুণরাই আগামীর বাংলাদেশ। তাদের কর্মক্ষম ও উদ্যোক্তা তৈরির বিশেষ উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে। বাজেট থেকে আলাদা বরাদ্দ দিয়ে বড় অংকের ‘গবেষণা ও উন্নয়ন তহবিল’ গড়ার প্রয়োজন রয়েছে। এই তহবিল দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ‘ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কীম’ গড়ে তুলে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্যে বেশি বেশি এসএমই ঋণের প্রবাহ নিশ্চিত করা সম্ভব। ব্যক্তিখাতকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ লাভের পর (যেমন ৫ অথবা ৭ কোটি) বাকী অংকের ওপর অন্তত তিন শতাংশ বাধ্যতামূলক সিএসআর তহবিল গঠনের আইন করা যেতে পারে। এই সিএসআরের এক তৃতীয়াংশ ব্যক্তিখাতের নিজস্ব ফাউন্ডেশন, এক তৃতীয়াংশ অন্যান্য অলাভজনক প্রতিষ্ঠানকে এবং বাকিটা সরকারের ‘আর অ্যান্ড ডি ফান্ডে’ যুক্ত হতে পারে। আগামীতে যে নতুন সরকার আসবে তারা যেন তরুণ উদ্যোক্তাদের স্বার্থে এমন একটি সামাজিক সংবেদনশীল আইন পাশ করে।

তবে তরুণরা শুধু তাদের বা দেশের উন্নয়নেই পুরোপুরি সন্তুষ্ট থাকবে সে কথা জোর দিয়ে বলা যাবে না। তরুণ মন খুবই সংবেদনশীল। তারা পরিবর্তন, সততা ও নীতি নৈতিকতায় বিশ্বাসী। তাই রাতারাতি দল বদলানো মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধীদের সুবিধাবাদী রাজনীতি তাদের হতাশ করে। সুশাসন তাদের আরাধ্য। দুর্নীতিকে তারা ঘৃণা করে। তারা মানবাধিকারে বিশ্বাসী। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা তাদের কাম্য। দুঃখী মানুষের দুঃখ এবং মেহনতি মানুষের অসম্মান দেখতে তাদের কষ্ট হয়। সমাজে অশান্তি, ধর্মান্ধতা ও উগ্রতা ও সন্ত্রাস সৃষ্টিকারীদের তারা অপছন্দ করে। তা সত্ত্বেও তাদের কেউ কেউ হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে এধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত কাজে যুক্ত হয়ে যায়। হলি আর্টিজানের পর আমরা এমন দুঃসংবাদ যেমন শুনতে পেয়েছি তেমনি বেশিরভাগ তরুণ দল বেঁধে এসব সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে ঘৃণা প্রকাশে পিছপা হয়নি । তারাই ‘নিরাপদ সড়ক’ আন্দোলনকে স্বাগত: জানিয়েছে। কোটা সংস্কারের পক্ষ নিয়েছে।

তরুণদের এই বিচিত্র মনকে রাজনীতিকদের বুঝতে হবে। তাদের স্বপ্নকে ধরতে হবে। বিশেষ করে আসন্ন নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে হলে তরুণদের চাওয়া পাওয়াকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে হবে। তারা যেমন বাংলাদেশ চায় তেমনটি নির্মাণের প্রতিশ্রুতি যে দল যতোটা বিশ্বস্ততার সাথে দিতে পারবে ভোটের দিন তরুণ ভোটারদের কল্যাণে তাদের পাল্লাই ভারি হবে। এর প্রমাণ মেলে সম্প্রতি ‘কলরেডি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে করা এক হাজার আশি জন তরুণের (১৮-২৪ বছর বয়সী) ওপর জরিপের ফলাফল থেকে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের (১২ জেলা ও ২১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বাছাইকৃত) ১৮.১৬ শতাংশের প্রত্যাশা উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা যেন হয়। ১৬.৭৫ শতাংশ সুশাসনের পক্ষে। ১৫.৭০ শতাংশ চায় দুর্নীতিমুক্ত সমাজ। আর ১১.৫৪% চায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হোক। সব মিলিয়ে ৫১.৩ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছে তারা বর্তমান সরকারের পক্ষে ভোট দেবে। অবশ্য ৩০% চায় সরকারের পরিবর্তন। ১৮.৫% সিদ্ধান্ত নিতে পারে নি কোন দিকে যাবে। যারা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে তারা হয়তো ভোটই দিতে যাবে না। তাই এদের ভোট দিতে উৎসাহী করাটাও দলগুলোর অন্যতম এক দায়িত্ব। মনে রাখতে হবে এরা মোট ভোটের দশ শতাংশ।

সবশেষে বলবো, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী উন্নত বাংলাদেশ নির্মাণে কারা উপযুক্ত নেতৃত্ব দিতে পারবেন সে সিদ্ধান্ত তরুণ প্রজন্মকে ভেবেচিন্তে নিতে হবে। মনে রাখা চাই, এবারের নির্বাচন এক যুগসন্ধিক্ষণে হতে চলেছে। তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কোন দিকে হাঁটবে। মুক্তিযোদ্ধাদের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী উন্নত বাংলাদেশের দিকে নাকি ‘অদ্ভুত উটের পিঠে’ অন্ধকার পানে? তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে কাকে তারা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চায়। গত এক দশক ধরে নানা প্রতিকূলতা পায়ে দলে যিনি বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় তিনগুন করেছেন, স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত করেছেন তাঁকে, নাকি যিনি একুশে আগষ্টের মতো ঘৃণ্য অপকর্মের নেতৃত্ব দিয়ে আদালতে দন্ডিত হয়ে বিদেশে পালিয়ে রয়েছেন তাকে?

দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছেড়ে তরুণদের স্বপ্নের উন্নত বাংলাদেশ গড়ার রূপায়নের প্রয়োজনেই এই প্রশ্নের মিমাংশা আসন্ন নির্বাচনে হওয়া বাঞ্ছনীয়।


লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর এবং বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ

আপনার মন্তব্য :

Please enter your comment!
Please enter your name here