ভালোবাসা দিবসের অ-আ ক-খ

0


Published : ১৪.০২.২০১৯ ০৭:১৬ পূর্বাহ্ণ BdST

বছর ১৪ই ফেব্রুয়ারী আমেরিকা, ইংল্যান্ড, কানাডা সহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে পালিত হয়ে আসছে ভ্যালেন্টাইন ডে বা ভালবাসার দিন। এ দিনে প্রিয়জনকে ফুল, মিস্টি, চকলেট, কার্ড এবং অনান্য উপহার দিয়ে থাকেন সবাই। কোথা থেকে এলো হাজার বছরের বেশী পুরনো এই দিন? 


ইতিহাস
কিংবদন্তী আছে যে সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনের নাম অনুসারে এ দিনের নামকরন। খৃস্টান এবং রোমান ঐতিহ্য লুকিয়ে আছে এই দিনের পেছনে। ক্যাথলিক চার্চ অনুযায়ী কমপক্ষে তিনজন সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনের নাম পাওয়া যায়। এই তিনজনের প্রত্যেকেই শহীদ হন।

প্রচলিত একটি ধারনা হল যে সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন তৃতীয় শতাব্দীতে রোমে বাস করতেন। তখনকার রোমান সম্রাট ক্লডিয়াস- ২ বিশ্বাস করতেন যে বিবাহিত পুরুষেরা ভাল যোদ্ধা হয় না। তিনি ফরমান জারী করেন যে যুবকেরা বিয়ে করতে পারবে না। সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন এই অন্যায় মেনে নিতে পারেন নি। তিনি সম্রাটের ফরমান অগ্রাহ্য করে গোপনে যুবক যুবতীর বিয়ে দিতে থাকেন। সম্রাট তা যানতে পেরে সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করেন।

অন্য আরেক গল্প হল যে সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন রোমান সম্রাটের অত্যাচার, নিগ্রহের থেকে খৃস্টানদের পালাতে সাহায্য করতেন এবং সেই কারনেই মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হন।কথিত আছে যে জেলে থাকতে সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন তার জেলরক্ষকের কন্যার প্রেমে পড়েন এবং তিনি নিজে তার প্রেমিকাকে ভালবাসার শুভেচ্ছা “ভ্যালেন্টাইন” এর উপহার পাঠান। মারা যাওয়ার আগে তিনি তার প্রেমিকাকে চিঠি লিখে যান যার শেষ বাক্য ছিল “ তোমার ভ্যালেন্টাইনের কাছ থেকে” বা “From your Valentine,”
সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনের গল্প কোনটা সত্যি তা নিয়ে হয়ত দ্বিমত আছে তবে মধ্যযুগ থেকেই সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন ইংল্যান্ডে এবং ফ্রান্সে প্রবাদ পুরুষ। তিনি ভালবাসা, প্রেম, বীরত্ব এবং সহমর্মিতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছেন সেই সময় থেকেই।
অন্য একদলের বিশ্বাস যে সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপনের জন্য খৃস্টানেরা মধ্য ফেব্রুয়ারীতে “ ভ্যালেন্টাইন” ভোজ এর আয়োজন করতেন।

রোমান ঐতিহ্য অনুসারে মধ্য ফেব্রুয়ারীতে পালিত হত পৌত্তলিক রোমানদের উৎসব “ লুপারসেলিয়ায়” (Lupercalia)। ফেব্রুয়ারী মাসের ১৫ তারিখ বা মধ্য ফেব্রুয়ারীতে পালিত হত এ উৎসব। নতুন জন্মের এ উৎসব নিবেদিত হত রোমান কৃষির দেবতা “ফোনাস”র উদ্দেশ্যে । রোমান পূরোহিতদের বলা হত “লুপারসি”। কথিত আছে রোমান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা রেমুস এবং রোমুলাস কে পাহাড়ের গুহাতে লালনপালন করে নেকড়ে বাঘ “লুপা”সেই পবিত্র গুহাতে লুপারসিরা মধ্য ফেব্রুয়ারীতে সমবেত হতেন।সেখানে নতুন জন্মের আশীর্বাদ চেয়ে দেবতার উদ্দেশ্যে পাঠা বলি দেওয়া হত আর আত্মশুদ্ধির প্রতীক হিসেবে বলি দেওয়া হত কুকুরের। পাঠার সে চামড়া রক্তে ভিজিয়ে তা দিয়ে যুবতীদের এবং শস্য ক্ষেত্রকে স্পর্শ করা হত। তাদের বিশ্বাস ছিল যে এই স্পর্শ ভূমি এবং যুবতীদেরকে আরো ফলদায়ীনি করবে। বিকেলের দিকে কুমারী যুবতিদের নাম লিখে রাখা হত এক বড় পাত্রে যেখান থেকে অবিবাহিত পুরুষেরা তাদের সঙ্গী বেছে নিত। লুপারসেলিয়া টিকে ছিল খৃস্ট ধর্মের গোড়ার দিনগুলোতে । লুপারসেলিয়া উৎসবকে খৃস্টান ধর্মের সাথে অসামঞ্জস্য পুর্ন বিবেচনা করে ৫ম শতাব্দীতে পোপ গেলাসিয়াস ১৪ ই ফেব্রুয়ারীকে ‘ সেইন্ট ভ্যালন্টাইন দিবস” হিসেবে ঘোষনা করেন। এ দিনকে ভালবাসার দিন হিসেবে জনপ্রিয়তা পেতে সময় লেগেছে আরো অনেক বছর। মধ্যযুগে ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সে বিশ্বাস ছিল যে ১৪ ই ফেব্রুয়ারী থেকে সে দেশে পাখীদের প্রজনন শুরু। সে বিশ্বাস সাহায্য করেছে ১৪ই ফেব্রুয়ারীকে ভালবাসার দিন হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে । ১৪ই ফেব্রুয়ারির ভ্যালেন্টাইন দিনের সবচে পুরনো লেখা হল লন্ডনের বৃটিশ লাইব্রেরীতে রক্ষিত অর্লিয়ান্সের ডিউক, চার্লসের কবিতা। এজিনকোর্টের যুদ্ধে পরাজয়ের পর টাওয়ার অফ লন্ডনে বন্দী থাকা অবস্থায় ডিউক ১৪১৫ সালে তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে লিখেন সে কবিতা। এর কয়েক বছর পর ইংল্যান্ডের রাজা হেনরী-৫ প্রেমিকা ক্যাথরিন ভালোয়ার উদ্দেশ্যে ভ্যালেন্টাইন দিবসে কবিতা লেখান লেখক জন লিন্ডগেটকে দিয়ে।

ভ্যালেন্টাইন ডের কিছু তথ্যঃ-
প্রতিবছর এই দিনে পৃথিবীতে ১৫ কোটি ভ্যালেন্টাইন কার্ড দেওয়া নেওয়া হয়।খৃসমাসের পর এটাই দ্বিতীয় বৃহত্তম কার্ড দেওয়া নেওয়ার দিন।
৮৫% উপহার কেনেন মহিলারা।
ক্রমানুসারে শিক্ষক, ছেলেমেয়ে, মা, স্ত্রী, প্রেমিকা এবং পোষা জীবজন্তু ভ্যালেন্টাইনের গিফট পান।
৩% লোক তাদের পোষা প্রানীদেরকে ভ্যালন্টাইন ডে’র উপহার দিয়ে থাকেন। তাদের বক্তব্য হল পশু পাখির ভালবাসা মানুষের ভালবাসার চেয়ে অনেক খাটি।
মা দিবস এবং ভ্যালেন্টাইন দিবস হল সবচে বেশী ফুল উপহারের দিন । এ দিন সারা পৃথিবীতে ৫ কোটির ও বেশী লাল গোলাপ উপহার দেওয়া হয়ে থাকে।
ভ্যালেন্টাইন ডে’র ফুল ক্রেতাদের মধ্যে ৭৩% পুরুষ এবং ২৭% মহিলা।
শেক্সপেয়ারের নাটক “রোমিও জুলিয়েট” এর রোমিও এবং জুলিয়েট ইতালীর ভেরোনা শহরের বাস করতেন। সেই নাটকের সূত্র ধরেই আজও জুলিয়েট এই দিনে প্রায় এক হাজার ভ্যালেন্টাইন ডে’র কার্ড পেয়ে থাকেন।
১৮৭৬ সালের ভ্যালেন্টাইন ডে তে আলেক্সান্ডার গ্রাহাম বেল টেলিফোন আবিস্কারের প্যাটেন্ট এর জন্য আবেদন জানান।
ভ্যালেন্টাইন ডের উপহার হিসেবে প্রখ্যাত চকোলেট নির্মাতা ক্যাডবেরী, প্রথম হৃদয় আকৃতি’র বাক্সে চকোলেট উপহারের প্রচলন করে।
কোন কোন দেশে যুবকরা পানি প্রার্থনা করে যুবতীদের কাপড় চোপড়ের উপহার বাক্স পাঠিয়ে থাকেন। যুবতী বাক্স গ্রহন করলে ধরে নেওয়া হয় যে তিনি প্রেরনকারী যুবকের সাথে বিয়ে তে রাজী আছেন।
কোরিয়া তে যুবতীরা এ দিনে কোন উপহার না পেলে শোকের চিহ্ন হিসেবে রেস্তোরাতে গিয়ে কাল স্যুপ খেয়ে থাকে।

ভ্যালেন্টাইন ডে’র প্রতীক

এ দিনের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হল ভালোবাসা। বেশ কিছু প্রতীক ব্যবহার করা হয় ভ্যালেন্টাইন ডে উপলক্ষে-
কিউপিড বা বামুন- রোমান পৌরানিক উপাখ্যানমতে কিউপিড ছিলেন প্রেমের দেবতা ভেনাসের পূত্র। কিউপিড হলেন খর্বাকৃতির বালক, হাতে তার তীর ধনুক, পিঠে তুন এবং এক জোড়া পাখা লাগানো। তিনি তার তীর ছূড়ে যুবক যুবতীর মনে প্রেমের সঞ্চার করেন।
হার্ট – জোড়া গোলাপী হার্ট হল আবেগ এবং ভালবাসার প্রতীক।
লাল গোলাপ- ভালবাসা এবং গভীর অনূভূতির প্রতীক হল লাল গোলাপ। ভ্যালেন্টাইন ডে’র প্রতীক হিসেবে লাল গোলাপ ফুল সবচে বেশী জনপ্রিয়।

ভ্যালেন্টাইন ডে’র কুসংস্কার

ভ্যালেন্টাইন ডে তে যুবতী মেয়ে যে পাখি প্রথম দেখবে তার স্বামী হবে সেই অনুসারে যেমন- চড়ুই দেখলে তার স্বামী হবে গরীব, পেচা দেখলে তার কোনদিন বিয়ে হবে না। নীল পাখী দেখলে স্বামী হবে সুখী মানুষ, কালো পাখি দেখলে স্বামী হবে পাদ্রী, দোয়েল দেখলে স্বামী হবে নাবিক, গোল্ডফিঞ্চ পাখি দেখলে স্বামী হবে ধনী কোটিপতি, আর ক্রসবিল পাখী দেখলে স্বামী হবে ঝগড়াটে।
একটা আপেল অর্ধেক করে কাটলে সে অর্ধেকে যতগুলো বিচি পাওয়া যাবে সেই মেয়ের ততগুলো ছেলেমেয়ে হবে।

সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন ডে ম্যাসাকার

১৯২৯ সালের এই দিনে আমেরিকার শিকাগো শহরে ৭ ব্যাক্তি কে গ্যারাজের মধ্যে নৃশংস ভাবে গুলি করে হত্যা করা হয় যা ভ্যালেন্টাইন ডে ম্যাসাকার হিসেবে খ্যাত।

এন্টিভ্যালেন্টাইনিজম

পৃথিবীর অনেক দেশে আবার ভ্যালেন্টাইন ডের বিরুদ্ধে মতবাদ গড়ে উঠছে। মুস্লিম দেশগুলোতে এই দিনকে “ ইসলাম বিরোধী আখ্যা দিয়ে তা পালন করা থেকে বিরত থাকার জন্য আহবান জানানো হচ্ছে’ গত বছর মালয়েশিয়ায়তে এই দিন পালন করার অপরাধে ১০০ জন তরুন তরুনীকে গ্রেফতার করা হয়। ভারতেও উগ্র হিন্দুবাদী সঙ্গঠন শিবসেনা ভ্যালেন্টাইন ডে পালনের ব্যাপারে হুশিয়ারী দিয়ে থাকে। সব কিছুর পর ও কিন্ত ভ্যালেন্টাইন ডে ‘র জনপ্রিয়তা বাড়ছে। এমন কি পাকিস্তানেও এই দিন আরো বেশী করে জনপ্রিয় হচ্ছে। আমার ধারনা, সারা পৃথিবীতে এই দিন আরো বেশী জনপ্রিয় হবে । মানুষের মন থেকে ভালবাসা মুছে ফেলা যাবে না। অনেকটা সেই প্রবাদের মত “ you can bring your horse to the water but you can not make it drink” – ঘোড়াকে পানির কাছে টেনে নিয়ে যেতে পারেন কিন্তু তাকে দিয়ে পানি খাওয়ানোর নিশ্চয়তা দিতে পারেন না”

ভ্যালেন্টাইন ডে’র চুটকি

ভ্যালেন্টাইন ডে তে সকালে ঘুম থেকে উঠে স্ত্রী স্বামীকে – “ হ্যা গো কাল রাতে স্বপ্ন দেখলাম যে এ বারের ভ্যালেন্টাইন ডে তে তুমি আমাকে হীরার নেকলেস উপহার দিচ্ছ, এ স্বপ্নের মানে কি?” স্বামী – “আজ সন্ধাবেলাতেই তা জানতে পারবে” সন্ধ্যাবেলা ছোট সুন্দর প্যাকেট হাতে স্বামী বাসায় ফিরলেন। স্ত্রী প্যাকেট খুলে যা পেলেন তা হল একটা বই, নাম “ সহি খোয়াব নামা- কি স্বপ্ন দেখিলে কি হয়।”

আপনার মন্তব্য :

Please enter your comment!
Please enter your name here