ভাষাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসুন

0


Published : ০৭.০৩.২০১৯ ০৯:৪৬ পূর্বাহ্ণ BdST

নুসরাত জাহান মীম   


১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে আমরা অর্জন করেছি স্বাধীনতা । এই মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ দিয়েছিল লাখো মানুষ , বহু মানুষের আত্মত্যাগ ও বীরত্মের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে আমাদের নিজস্ব ভূখন্ড, আমাদের নিজস্ব ভাষা ,আমাদের মায়ের ভাষা – বাংলা ভাষা ।


এর ঠিক ১৯ বছর আগেই , ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন রফিক , বরকত, সালাম, জব্বার সহ নাম না জানা অনেকেই – কারণ একটাই “মাতৃভাষা বাংলা চাই”। টগবগে রক্ত শরীরে নিয়ে উনিশ বিশ বছরের তরুণরা তাদের মাতৃভাষা হিসেবে অন্য ভাষাকে কোন ভাবেই মেনে নিতে পারেনি । তাদের একটাই দাবি – মাতৃভাষা বাংলা চাই ।

১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ২১ তারিখ বাংলা ভাষার জন্য আত্মোৎসর্গের যে বীরত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে, সেই স্মৃতিকে অম্লান রাখতেই প্রতিবছর এই মাসে আয়োজন করা হয় ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ – যা বর্তমানে বইমেলা নামে পরিচিত । বইমেলা কে বলা হয় প্রাণের মেলা, যেখানে প্রতিবছর নতুন নতুন লেখকের আত্মপ্রকাশ ঘটে, জমে সাহিত্যের আড্ডা । বই পড়ার অভ্যাস আমাদের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে । একই ভাবে বই পড়ার মাধ্যমে আমরা নিজেরাও চিন্তা ভাবনার নতুন পথ খুঁজে পাই । সাহিত্য, কবিতা, আলোচনা, ছোটগল্প  সবসময়ই আমাদের মুক্তচিন্তার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায় । আর আমরা যা পড়ছি , যা দেখছি, যা শুনছি সেটা স্বভাবতই আমাদের ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশে অবদান রাখে ।  বলা বাহুল্য, এতটা তাৎপর্যপূর্ণ মেলা পৃথিবীর খুব কম দেশেই হয় আর আমাদের মত কোন জাতি আর নেই যারা ভাষার জন্য যুদ্ধ করেছিল ।

স্কুল কলেজে থাকতে বান্ধবীর সাথে কথা বলার সময় বলতাম হৈমন্তীর মত নরম হলে হবে না , ভেঙ্গে পড়লে কাজী নজরুল ইসলাম এর  চল চল চল কবিতাটি জোরে জোরে পড়তাম , ঘুমাতে যাবার আগে জসীম উদ্দিন এর কবর কবিতাটি পড়ে চোখ ভেজাতাম । খাটের মাথায় থাকতো হুমায়ুন আহমেদ জোছনা ও জননীর গল্প, জাফর ইকবাল এর আমার বন্ধু রাশেদ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর শেষের কবিতা আরো কত গল্পের বই ।

আজ থেকে ৬-৭ বছর আগেও আমরা প্রভাবিত হতাম বইয়ের এইসব লেখার মধ্য দিয়ে , বলতে গেলে বই ছিল আমাদের বিনোদন জগতের একটা অংশ । বর্তমানে প্রযুক্তির কল্যাণে  সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার ও বেসরকারি টিভি চ্যানেলের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবার কারনে আমাদের বিনোদন এর এক বিশাল অংশ জুড়ে স্থান করে নিয়েছে বিভিন্ন টিভি ও সোশ্যাল মিডিয়ার তারকরা । বর্তমানে বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোতে যেসকল নাটক প্রচারিত হচ্ছে সেগুলোর উপর বাংলা ভাষার সঠিক ব্যবহারের কোন বিধিনিষেধ না থাকার কারণে আমাদের চলতি শুদ্ধ বাংলা ভাষা ক্রমান্বয়েই বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে । উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে – খেয়েছো থেকে খাইসো, করেছি থেকে করসি , এমনকি বিনোদন এর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে এক ভিন্ন মাত্রার ভাষা – মাম্মা হোয়াটস আপ, এক্কেরে কুইট্টাইলবাম, আব্বার জিগায় ইত্যাদি । আর এইসব নাটক / বিনোদন মূলক অনুষ্ঠানের দর্শকদের মধ্যে এক বিশাল জনগোষ্ঠী হচ্ছে এদেশের বর্তমান তরুণ সমাজ । ফলস্বরূপ দেখতে পাচ্ছি , একসময় যে তরুণেরা বাংলা ভাষার জন্য নিজের জীবন পর্যন্ত ত্যাগ করেছে, ঠিক সেই তরুণেরাই  আজকের দিনে অবচেতন মনে বাংলা ভাষার বিকৃত ব্যবহারে অংশগ্রহণ করছে ।

অন্যদিকে সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের প্রিয় তারকাদের খুব সহজেই আমরা “ফলো” করতে পারছি অর্থাৎ খুব সহজেই তারা কি বলছে , কি লিখছে, কোথায় যাচ্ছে, কি করছে সব কিছুই অনুসরণ করতে পারছি । এই কারণে যখন আমরা দেখছি একজন তারকা বাংলা ভাষার বদলে “টিন এজদের ভাষা” দিয়ে গোটা একটা বই লেখে এবং সেই বই অমর একুশে গ্রন্থ মেলা তে স্থান পায় তখন আসলেই খুব কষ্ট হয় এই ভেবে যে ১৯৫২-১৯৭১ এ লাখ লাখ টিন এজদের আত্মত্যাগের কতটুকু মূল্যায়ন আমরা করতে পারছি ।

ভাষা যেমন আবহমান একই সাথে ভাষার মৃত্যুও অনিবার্য যদি সেটার সঠিক পরিচর্যা না করা হয় ।  আপরদিকে সাহিত্য শুধু একজন মানুষ কে প্রকাশ করে না, গোটা জাতি, তাদের চিন্তাধারা এর সম্মিলিত রুপ হল সাহিত্য । তাই একজন পাঠক, একজন মা এবং একজন শিক্ষক হিসেবে এদেশের উচ্চপদস্থ ও যাদের কে এদেশের তরুণেরা অনুসরণ করে তাদের প্রত্যেকের প্রতি অনুরোধ থাকবে দেশ, ভাষা ও তরুণদের চিন্তাধারা, মানসিকতা বাঁচাতে এগিয়ে আসুন ।

আপনার মন্তব্য :

Please enter your comment!
Please enter your name here