এমপ্লোয়াবিলিটি স্কিল বা কর্মদক্ষতা

0


Published : ০২.০৩.২০১৯ ০১:৩১ অপরাহ্ণ BdST

কে এম হাসান রিপন


কর্মদক্ষতা বা এমপ্লোয়াবিলিটি স্কিল বর্তমান সময়ে একটি গুরুত্বপূর্ন বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। এটি এমন একটি গুনাবলী যা একজন উদ্যোক্তা বা একজন চাকুরিদাতা তার চাকুরী প্রত্যাশি বা তার প্রতিষ্ঠানে যারা চাকুরী করছেন, এমন প্রত্যেকের কাছে প্রত্যাশা করে থাকেন। এর কারন কর্মদক্ষতা বা এমপ্লোয়াবিলিটি স্কিল যদি একজন প্রোফেশনাল বা একজন কর্মীর মধ্যে থেকে থাকে তাহলে তিনি তার কর্মক্ষেত্রকে বর্তমান অবস্থা থেকে অনেক দূরে নিয়ে যেতে তার অধিনস্ত কর্মচারী বা তার সহযোগীদের সাহায্য করতে পারেন।


আর ঠিক এই কারনেই একজন উদ্যোক্তা বা একজন চাকুরীদাতা সব সময় আশা রাখে যেন প্রত্যেক চাকুরী প্রার্থীর মধ্যে যেন সেই কর্মদক্ষতা বা এমপ্লোয়াবিলিটি স্কিলটি থাকে।

অন্যদিকে এই কর্মদক্ষতা বা এমপ্লোয়াবিলিটি স্কিলকে ট্রান্সফারাবেল স্কিল-ও বলা হয়ে থাকে। এর কারন এমপ্লোয়াবিলিটি স্কিলটি নির্দিষ্ট কোনো একটি জব সেক্টর এর জন্যে নয়। এর মানে এই স্কিলটি সব সময় প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যেই থাকে এবং এটি সম্পূর্ন তার নিজস্ব বা ব্যক্তিগত দক্ষতা যা কিনা সে বিভিন্ন সেক্টরে ট্রান্সফার করতে পারবে।

উদাহরনস্বরুপ ধরা যাক কোনো ব্যক্তি রেডিমেড গার্মেন্টস সেক্টরে কাজ করছে। এখন সেখান থেকে তিনি তার জবটি ছেড়ে কমিউনিকেশন সেক্টরে যেতে চাচ্ছে সেখানে তার ক্যারিয়ার গড়তে। সে ক্ষেত্রে একজন তিনি তার আগের প্রতিষ্ঠানের অর্থাৎ রেডিমেড গার্মেন্টস এর যে ফাংশনাল স্কিল বা টাস্ক গুলো সাথে করে নিয়ে যেতে পারবেন না। কিন্তু সেই ব্যক্তি তার সাথে করে তার নিজস্ব দক্ষতাগুলো ঠিকই টেলিকম সেক্টরে নিয়ে যেতে পারবে। ঠিক একই ভাবে যখন সে এখান থেকে অন্যকোনো সেক্টরে যাবে তখন সে ঠিকই তার সাথে করে তার নিজস্ব বা ব্যক্তিগত যেসব যোগ্যতা বা স্কিলস গুলো থাকবে তা সে নিয়ে যেতে পারবে। আর এই কারনেই কর্মদক্ষতা বা এমপ্লোয়াবিলিটি স্কিলকে ট্রান্সফারাবেল স্কিল-ও বলা হয়ে থাকে।

এখন তাহলে একটা প্রশ্ন আসে যে এই কর্মদক্ষতা বা এমপ্লোয়াবিলিটি স্কিলটি কেন প্রয়োজন বা এটি থাকলে একজন ব্যক্তি কি সুবিধা পেতে পারেন?

প্রথমত একজন ব্যক্তি যে প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করছে সেই প্রতিষ্ঠানটিতে তার কর্মদক্ষতা বা এমপ্লোয়াবিলিটি স্কিল এর দ্বারা তার নিজস্ব কাজকর্মগুলো সেই নিজে খুব সহজেই বুঝে নিতে পারবে বা তা নিজের টিমের সাথে একত্রে মিলে কাজ করতে পারবে। আবার সে নিজেই একটি কাজ তার কলিগ বা তার সহকর্মীকে বুঝিয়ে দিতে পারবে।

দুইটি বিষয় প্রায়ই একটি প্রতিষ্ঠানে লক্ষ্য করা যায়। একটি হল যেকোন নিজে কাজ বুঝে নেয়া, আর অন্যটি হল যেকোন কাজ কাউকে বুঝিয়ে দেয়া। সেক্ষেত্রে কাজগুলো যদি কোন ব্যক্তি ঠিক ভাবে বুঝে না নেয় তাহলে সে ঠিক ভাবে কাজটি সম্পাদন করতে পারবেন না। আবার অন্যদিকে যদি সে কাজটি যদি বুঝিয়ে দিতে ব্যর্থ হয় তাহলে তার কলিগ বা সহকর্মী ঠিক ভাবে কাজটি করতে পারবে না। আর এই বুঝিয়ে দেয়া বা বুঝে নেয়া ঠিক তখনই সম্ভব যখন কোন ব্যক্তির মধ্যে কর্মদক্ষতা বা এমপ্লোয়াবিলিটি স্কিল থাকবে।

দ্বিতীয়ত একজন ব্যক্তির কর্মদক্ষতা বা এমপ্লোয়াবিলিটি স্কিলটি থাকলে তিনি যেকোন সমস্যা চিহ্নিত করতে সক্ষম হবেন বা যেকোন সমস্যা আসার পূর্বেই সেই বিষয়ে বিশ্লেষন করে তা উপর একটি প্রতিবেদন করতে পারবে।

তৃতীয়ত একজন ব্যক্তির কর্মদক্ষতা বা এমপ্লোয়াবিলিটি স্কিলটি থাকলে সে তার নিজস্ব স্কিলগুলোকে অর্থাৎ যে স্কিলগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ন বা প্রয়োজনীয় সেগুলোকে সে নিজেই চিহ্নিত করতে পারবে। এরপর সেই স্কিল গুলোর উপর যদি কোন কমতি বা ঘাটতি থাকে তবে সেই ঘাটতিগুলো পূরুন করতে সে তার স্কিল উন্নয়ন করতে পারবে।

আর এই সব কিছু করা সম্ভব যখন কোনো ব্যক্তির কর্মদক্ষতা বা এমপ্লোয়াবিলিটি স্কিলটি থাকবে।

এখন একটি বিষয় লক্ষনীয় যে এই কর্মদক্ষতা বা এমপ্লোয়াবিলিটি স্কিল অর্জনের ক্ষেত্রে কি পরিমান সময় দরকার। আসলে কর্মদক্ষতা বা এমপ্লোয়াবিলিটি স্কিলটি অর্জনের নির্দিষ্ট কোন সময় নেই যে সেই সময়ের মধ্যেই কর্মদক্ষতা বা এমপ্লোয়াবিলিটি স্কিলটি অর্জন করতে হবে। একটা বিষয় মনে রাখতে হবে যে, যত দ্রুত এই এমপ্লোয়াবিলিটি স্কিলটি নিশ্চিত করা যাবে ঠিক তত দ্রুত ক্যারিয়ারের অগ্রগতি বা উন্নয়ন করা সম্ভব।

কর্মদক্ষতা বা এমপ্লোয়াবিলিটি স্কিলটির সাথে আরও একটি স্কিল অতঃপ্রত ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর সেটি হল পার্সোনাল কোয়ালিটি। কারন এর সাথে এমপ্লোয়াবিলিটি স্কিলটির খুব মিল আছে।

বলা যায়, এমপ্লোয়াবিলিটি স্কিল = পার্সোনাল কোয়ালিটি

পার্সোনাল কোয়ালিটি মুলত ৩টি পিলারের উপর নির্ভরশীল। তাহল,

পিলার নম্বর ১ পার্সোনাল পজিটিভ এট্রিবিউটস

পিলার নম্বর ২ হিউম্যান রিলেশনশীপ

পিলার নম্বর ৩ সুপিরিয়র ওয়ার্ক পারফরমেন্স

এই ৩টি পিলার যখন একজন পেশাজীবি নিশ্চিত করবে তখন তার সাথে সাথে এমপ্লোয়াবিলিটি স্কিলটিও  সুনিশ্চিত হবে।

এবার এমপ্লোয়াবিলিটি স্কিলটির যদি একটু গভীরে যাওয়া যাক। যদি এমপ্লোয়াবিলিটি স্কিলটি নিয়ে একটু বিশদ ভাবে ভাবি তাহলে বিভিন্ন বিষয় আসবে। তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু বিষয় তুলে ধরা হল।

ফান্ডামেন্টাল স্কিলঃ একজন ব্যক্তি তার প্রতিষ্ঠানে কতটুকু যোগ্যতাসম্পন্ন । সেক্ষেত্রে তিনি তার অফিসের নিয়ম কানুন কতটুকু মেনে চলেন, সে কতটুকু তথ্য সন্ধানকারী, তার যে নিয়মিত কাজগুলো থাকে সে তা কতটুকু যত্ন সহকারে করছে বা কত দ্রুত করছে ও কাজের নির্দিষ্ট ডেডলাইন মেনে চলছে কিনা ইত্যাদি সবকিছু ফান্ডামেন্টাল স্কিল এর অন্তর্গত। অর্থাৎ যদি কর্মদক্ষতা বা এমপ্লোয়াবিলিটি স্কিলটি অর্জন করতেই হয় তাহলে অবশ্যই ফান্ডামেন্টাল স্কিলটি থাকতেই হবে।

ইন্টারপার্সোনাল স্কিলঃ এটি মূলত এমন একটি স্কিল যা খুবই গুরুত্বপূর্ন। ইন্টারপার্সোনাল স্কিল বলতে একটি প্রতিষ্ঠানে একজন কর্মী বা চাকুরীজীবি তার প্রতিষ্ঠানের কলিগ বা সহকর্মী বা আশেপাশে যারা আছেন তাদের সাথে তার ব্যবহার, আচার আচরন কেমন। অর্থাৎ সে কি শান্ত স্বভাবের নাকি ঘগড়াটে, সেই তার সহকর্মীদের সহায়তা করে, সে কি তার কর্মীদের সমস্যা নিজে অনূভব করে। আর এই সব গুলো হল ইন্টারপার্সোনাল স্কিল।

কমিউনিকেশন স্কিলঃ কমিউনিকেশ্ন স্কিল ব্যক্তিজীবন বা কর্মজীবন দুইটি ক্ষেত্রেই বিশেষভাবে ভূমিকা পালন করে। কারন আমরা আমাদের জীবনে যেকোন কিছু যোগাযোগের মাধ্যমে সম্পন্ন করি। লেখা লেখি থেকে শুরু করে কথা বলা, উপস্থাপন করা, অঙ্গভঙ্গি সবকিছু মিলেই কমিউনিকেশন স্কিল। এখন কেউ যদি ঠিকভাবে লিখে বা কথা বলে অথবা অঙ্গভঙ্গি কিংবা ইশারা দ্বারা কিছু উপস্থাপন বা না বুঝাতে পারে তাহলে সেক্ষেত্রে কোনভাবেই কাজ করা সম্ভব হবেনা। আর তাই কমিউনিকেশন খুবই গুরুত্বপূর্ন।

প্রোব্লেম সল্ভিং স্কিল বা সমস্যা দূরীকরন ক্ষমতাঃ আমাদের সমাজে যেকোনো স্থানেই সমস্যা বিদ্যমান। এখন এই ক্ষেত্রে ২টি বিষয় আসে। আমরা কি সেই সমস্যাগুলো নির্ধারন করতে পারছি বা সেটা নির্ধারনের পর আমরা কি বসে থাকছি না সেটা নিরসনের উপায় খুজছি। যদি উপায় খুজে বের করতে সক্ষম হই তাহলে সেটা ব্যবহার করে সমাধান করতে পারছি কিনা এই বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ন। আর প্রত্যেক চাকুরীদাতা তার চাকুরী প্রার্থীর কাছ থেকে এই স্কিলটি অনেক বেশি আশা করে থাকে।

টিম ওয়ার্কঃ  টিম ওয়ার্ক জিনিসটি কর্মক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপুর্ন ভূমিকা পালন করে। কারন কর্মক্ষেত্রে টিম ওয়ার্কটি অনেক বেশি প্রাকটিস করা হয়। একার পক্ষে কোনো কাজ শেষ করা সম্ভব নয়। তাই প্রতিষ্ঠানে অনেকে মিলে একসাথে গ্রুপে বা টিমে কাজ করতে হয়। এক্ষেত্রে একটি বড় কাজ টিমের সকল সদস্যদের মধ্যে ভাগ করে দিয়ে কাজের পরিধি ছোট করা হয়। যাতে অতি সহজেই কাজ শেষ করা যায়। এখন সেক্ষেত্রে যদি কোন ব্যক্তির টিম ওয়ার্ক স্কিল না থাকে তাহলে সে কাজ করতে পারবেনা। অর্থাৎ তখন প্রতিষ্ঠানের কাজ পরে থাকবে। তাই টিম ওয়ার্ক স্কিল খুবই গুরুত্বপূর্ন।

এথিকাল স্কিল বা নীতিঃ একটা বিষয় প্রায়ই দেখা যায় অনেক প্রতিষ্ঠানে কিছু কিছু মানুষ থাকে যারা সামান্য স্বার্থ সিদ্ধির জন্য অন্যের কোন মতামত বা নতুন কোনো বিজনেস  প্রোপোজাল বা আইডিয়া বসের কাছে নিজের বলে বসের কাছে চালিয়ে দেয়। কিন্তু এই বিষয়টি এথিকাল বা নীতির বাইরে পরে। আর তাই এথিকাল স্কিল বা নীতি গত ব্যবহার বিষয়টি অনেক প্রয়োজনীয় একজন ব্যক্তির জন্যে।

ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট স্কিলঃ ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট স্কিলটি একজন ব্যক্তির জ্ন্যে অনেক গুরুত্বপুরুর্ন। ধরা যাক কোনো ব্যক্তি নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানে যোগদান করেছে। সে ক্ষেত্রে ৬ মাসের মধ্যেই তাকে কোনো না কোনো নতুন স্কিল অর্জন করতে হবে। হোক সেটা সফট স্কিল বা ফাংশনাল স্কিল। এখন ব্যাপার হল সেই ব্যক্তি কি সেই দক্ষতাগুলো খুজে বের করতে পারছে কিনা বা অন্যের কাছ থেকে সেই দক্ষতা গুলো শিখে নিতে পারছে কিনা এবং সে কি সবসময় শেখার মানসিকতা নিয়ে আছে কিনা এইটাই হল ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট স্কিল।

লিডারশীপ স্কিলঃ  লিডারশীপ স্কিল একটি প্রতিষ্ঠানের জন্যে অনেক প্রয়োজনীয় একটি স্কিল। একজন কর্মী লিডারশীপ স্কিল থাকাটা অনেক গুরুত্বকপূর্ন। এক্ষেত্রে সেই কর্মী তার প্রতিষ্ঠানের সহকর্মীদের কোচ হতে পারবে কিনা, সে তার দক্ষতাগুলো অন্যদের কাছে শেয়ার করতে পারবে কিনা, কোনো বিষয়ে আলোচনা বা মটিভেট করতে পারছে কিনা এইগুলো সবকিছু হচ্ছে লিডারশীপ স্কিল।

ইনিশিয়েটিভ স্কিল বা উদ্যোগ গ্রহন ক্ষমতাঃ  আজকাল উদ্যোগ গ্রহন ক্ষমতা খুবি প্রয়োজনীয় একটি স্কিল। প্রায়ই  অনেক প্রতিষ্ঠানের দেখা যায় কিছু লোক নিজে কাজের উদ্যোগ নেয় আবার অনেকে আছে উর্ধতন কর্মকর্তা আদেশের জন্যে বসে থাকে। এই জিনিষটা অনেক উর্ধতন কর্মকর্তাকে বিরক্ত করে তোলে। তারা আশা করে তাদের আওতায় যারা কাজ করে তারা প্রত্যেকেই যেন নিজে কোনো বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহন করতে পারে। আর তাই উদ্যোগ গ্রহন করার ক্ষমতা থাকাটা প্রত্যেকের জন্যে আবশ্যক।

ট্যেকনলজিকাল স্কিলঃ   বর্তমান সময়ে টেকনলজি অত্যান্ত ব্যাপক ভাবে বিস্তার লাভ করেছে। সমাজের যেকোনো ক্ষেত্রে এর ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর তাই সভ্যতার সাথে সাথে আমাদের উচিত এই টেকনলজি গ্রহন করা। এর মধ্যে বিশেষ করে কম্পিউটার এপ্লিকেশন, ইন্টারনেট ইত্যাদি বিষয়ে যত বেশি জ্ঞান লাভ করা যায় তত বেশি কর্মক্ষেত্রে উপকৃত হওয়া যাবে।

আর উপরের এই সকল বিষয়গুলো কর্মদক্ষতা বা এমপ্লোয়াবিলিটি স্কিল এর অন্তর্গত। যা একজন ব্যক্তিকে তার কর্মজীবনে সফল ভাবে টিকে থাকতে সাহায্য করবে।


লেখকঃ উপদেষ্টা, বাংলাদেশ স্কিল ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট

আপনার মন্তব্য :

Please enter your comment!
Please enter your name here